হযরত বাবাভান্ডারীর আধ্যাত্নিক ক্ষমতা প্রচুর ছিলো যিনি ছিলেন বিংশ শতকের একজন বিখ্যাত সুফি সাধক।তার প্রভাব এতটাই বেশি যে, বাংলাদেশের কোণে কোণে তো বটেই, সমগ্র বিশ্বে তার অসংখ্য আশেক রয়েছেন, তার নামের ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে।
গাউসুল আযম হযরত সৈয়দ গোলামুর রহমান আল হাসানী ওয়াল হোসাইনী (রহঃ) আমাদের প্রিয় নবিজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর ২৮তম বংশধর। তিনি ১৮৬৫ সালে, ১২৭০ বঙ্গাব্দের ২৯শে আশ্বিন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার মাইজভাণ্ডার গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মাইজভাণ্ডারী তরিকার মহান প্রবর্তক হযরত সৈয়দ আহমদউল্লাহ্ মাইজভাণ্ডারী (কঃ)[১৮২৬-১৯০৬] এর ভাইয়ের ছেলে।
তাদের পূর্বপুরুষ হযরত সৈয়দ হামিদউদ্দিন গৌরী (রহঃ), ১৫৭৫ সালে তৎকালীন গৌড়ের প্রধান বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য আরব থেকে বাংলায় আসেন।
পরবর্তীতে তারই বংশধারা ক্রমান্বয়ে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির মাইজভাণ্ডার গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। মাইজভাণ্ডার গ্রামের নাম অনুসারে তাদের নামের শেষে মাইজভাণ্ডারী নামটি যুক্ত হয়েছে এবং এ তরিকার নামও ‘তরিকা-এ-মাইজভাণ্ডারীয়া’ হয়েছে।
গাউসুল আযম হযরত সৈয়দ গোলামুর রহমান আল হাসানীকে তার আশেকানরা গভীর ভালোবাসায়- ‘বাবাভাণ্ডারী’ বলে ডাকতেন। তাই তিনি “বাবাভাণ্ডারী” নামটিতেই বিশ্বজুড়ে পরিচিত।
তার চেহারা মুবারক এতটাই সুন্দর ছিলো যে, সকলে তাকে দেখে গভীর বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতেন। তার মুখমণ্ডল থেকে সর্বদা নূরের জ্যোতি নিঃসরিত হতো। তাকে শুধু এক পলক দেখেই অনেক অমুসলিম, ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন।
তার জন্মের পর গাউসুল আযম সৈয়দ আহমদউল্লাহ্ মাইজভাণ্ডারী (কঃ) এর কাছে নেয়া হলে, গাউসুল আযম হযরত সৈয়দ আহমদউল্লাহ্ মাইজভাণ্ডারী (কঃ) শিশুকে দেখে বললেন,
“এ শিশু আমার বাগানের শ্রেষ্ঠ প্রস্ফুটিত গোলাপ। হযরত ইউসুফ (আঃ) এর মত অপরূপ সৌন্দর্য তার চেহারায় বিরাজমান। তোমরা তার যত্ন নাও। আমি তার নাম ‘গোলামুর রহমান’ রাখলাম।”
শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম। তার দোলনা, কারো সাহায্য ছাড়া এমনিতেই দোল খেতো। তিনি শিশু অবস্থায়ও কখনো বিছানা নষ্ট করতেন না। তার প্রয়োজন হলে তার চেহারায় কিছু লক্ষণ দেখে তার মা বুঝতে পারতেন। তার জন্মের পর তার পরিবারে বরকত বাড়তে থাকে। সে বছর ব্যাপক ফসল উৎপাদিত হয়েছিলো। দুগ্ধজাত গরু থেকে অভাবনীয় দুধ পাওয়া যেতে থাকে। এ সমৃদ্ধির জন্য সকলে এ শিশুকে খোদার এক বিশেষ রহমত হিসেবে বিবেচনা করতে থাকেন। তবে তার জন্মের আগেই, তার মাকে গাউসুল আযম আহমদউল্লাহ্ মাইজভাণ্ডারী (কঃ) বলেছিলেন,
“তুমি পীরানে পীর সাহেবের মাতা।”
যখন তিনি গর্ভে ছিলেন তখনও তার মা স্বপ্নে হযরত খাদিজা (রাঃ), হযরত ফাতিমা (রাঃ), হযরত মরিয়ম (আঃ) হযরত আছিয়া (আঃ) এর মতো মহীয়সী নারীদের পক্ষ থেকে সুসংবাদ পেয়েছিলেন।
শৈশবে পারিবারিক ফোরকানিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হলে, মাদরাসার শিক্ষক তার অসাধারণ মেধা দেখে, তার সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বানী করেন যে, “তিনি একজন বড় আলেম ও অলিয়ে কামেল হবেন।”
ফোরকানিয়া মাদ্রাসার শিক্ষা শেষ করে তিনি চট্টগ্রাম মুহসেনিয়া মাদরাসায় ভর্তি হন। ছাত্রাবস্থায় তিনি একটি বাড়িতে গৃহশিক্ষক হিসেবে থাকতেন। গভীর রাতে তিনি অত্যন্ত গোপনীয়তা রক্ষা করে একাকী বেড়িয়ে যেতেন। একটি মসজিদে গিয়ে নামাযে ইমামতি করতেন। তার পেছনে নামায পড়তেন সাদা পোশাকের সুন্দর চেহারার কিছু মানুষ। মূলত এরা ছিলেন ফেরেশতা অথবা পবিত্র কোন সত্তা। ফজরের সময় শুরু হতে হতে তারা চলে যেতেন।
বাবাভাণ্ডারী সারাবছরই রোজা রাখতেন। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ও ক্লাসে ১ম স্থানের অধিকারী ছিলেন।
২৫ বছর বয়সে যখন মাদ্রাসার জামাতে উলার ফাইনাল পরীক্ষা দিতে বসেন, তিনি খোদায়ী প্রেমে, আধ্যাত্নিকতার এমন এক পর্যায়ে পৌঁছলেন যে জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। তাকে মাইজভাণ্ডার শরীফে নিয়ে আসা হলো। যিনি মহান আল্লাহর অসীম প্রেমের ও জ্ঞানের মহাসমুদ্রে অবগাহন করতে চলেছেন, তার জন্য পৃথিবীর সাধারণ শিক্ষার প্রয়োজন হয় না।
তিনি গাউসুল আযম আহমদউল্লাহ্ মাইজভাণ্ডারী (কঃ) এর ঘরের কাছে সবসময় পড়ে থাকতেন। দিনের পর দিন না খেয়ে থাকতেন। সারাদিন কুরআন তিলাওয়াত করতেন। এক দৃষ্টিতে গাউসুল আযম আহমদউল্লাহ্ মাইজভাণ্ডারী (কঃ) এর দিকে তাকিয়ে থাকতেন। তার চরণযুগল ধরে আঁকড়ে রাখতেন। এভাবে খোদা ও মুর্শিদের প্রেমে তিনি বিলীন হয়ে যেতে লাগলেন। পার্থিব কোন ধ্যান-জ্ঞান তার মাঝে দেখা যায় না।
হঠাৎ একদিন তিনি গাউসুল আযম আহমদউল্লাহ্ মাইজভাণ্ডারী (কঃ) এর ইশারায় ঘর থেকে বের হয়ে গহীন জঙ্গলে, উঁচু পাহাড়ের দুর্গম গুহায় একাকী আল্লাহর ধ্যান করতে থাকলেন। এভাবে তিনি দীর্ঘ ১২টি বছর একাকী ধ্যান করেছেন।
তিনি নদী, সমুদ্র পাঁড়ি দিয়ে নির্জন স্থানগুলোতে যেতেন। এসব স্থানে কোন মানুষের আনাগোনা ছিলো না। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় পাওয়া যায়, বনের হিংস্র বাঘ, হায়না, সাপ, কুকুর তার চারপাশে এসে বসে থাকতো। তার বসার স্থান থেকে এক ধরনের উজ্জ্বল আলো বিচ্ছুরিত হতো। অনেক সাদা পোশাকধারী তার সাথে এসে সাক্ষাৎ করে আবার অদৃশ্যে মিলিয়ে যেতেন। গহীন পাহাড়ে এ ঘটনাগুলো দেখে অসংখ্য চাকমা, মারমা, উপজাতি অমুসলিমরা তার হাতে হাত রেখে ইসলাম গ্রহণ করেন। তার স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহ এখনও ভক্ত আশেকান ও গবেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থান এবং পর্যটনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এভাবে গভীর সাধনার পরে, একদিন গাউসুল আযম আহমদউল্লাহ্ মাইজভাণ্ডারী (কঃ) এর নির্দেশে তাকে খোঁজার জন্য ও ফিরিয়ে আনার জন্য লোক পাঠানো হয়। ১২ বছর পর মাইজভাণ্ডার দরবারে তিনি ফিরে আসলেন। কিন্তু কারো সাথে কথা বলতেন না। চাদর পেঁচিয়ে নিজেকে লুকিয়ে রাখতেন। যখন ইচ্ছা হতো দু এক কথা বলতেন বা চাদরটি সরিয়ে নিজের অপূর্ব রূপ দেখাতেন।
তার আধ্যাত্নিক ক্ষমতা ছিলো অভাবনীয়। কেউ তার কাছে এসে দোয়াপ্রার্থী হয়ে খালি হাতে ফিরতো না। মূলত মহান আল্লাহ্ তার প্রিয় বান্দাদের দোয়া ফিরিয়ে দেন না বলেই আল্লাহর অলিগণের কাছে গেলে মানুষের মনের আকাঙ্খা আল্লাহ্ পূরণ করেদেন।

